Bhutan (Thimphu - Punakha - Paro)

আমাজন জঙ্গলে (পর্ব - ১)

"A nation that destroys its soils destroys itself. Forests are the lungs of our land, purifying the air and giving fresh strength to our people." ~Franklin D. Roosevelt

ছবিঃ আমাজনের জঙ্গলে আমাদের ক্যাম্প 

আমাজন জঙ্গলের সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল তিন গোয়েন্দার ভীষণ অরণ্য বইটির মাধ্যমে। কল্পনার জগতে কিশোর , মুসা আর রবিনের হাত ধরে ঘুরে এসেছিলাম আমাজনের গহীন জঙ্গল থেকে, যেখানে পদে পদে ছিল রোমাঞ্চ আর বিপদের হাতছানি। কখনো ভাবিনি ছোটবেলার সেই স্বপ্ন  একদিন সত্য হয়ে ধরা দিবে। আজকের গল্পটা সেই স্বপ্ন সত্যি হওয়ার গল্প ।

প্রস্তুতি

প্রায় এক সপ্তাহ ধরে পেরুর লিমা, মাচু পিচু এবং লেক টিটিকাকা ভ্রমণ শেষ করে আমাদের আমাজন অ্যাডভেঞ্চার শুরু হল। প্রথমে পৃথিবীর সর্বোচ্চ হ্রদ "লেক টিটিকাকাকে" ঘিরে গড়ে ওঠা শহর পুনো থেকে যেতে হবে ইকুইতোস, সেখান থেকে গাইড নিয়ে যাব ক্যাম্পিং এ আমাজনের গহীন জঙ্গলে। পেরুর বিখ্যাত পাকাইয়া সামিরিয়া জাতীয় উদ্যানে এক সপ্তাহ ক্যাম্পিং করার ইচ্ছা আমাদের। পাক্কা এক সপ্তাহ আমাজনের গহীন জঙ্গলে ঘুরে বেড়াব, রাত হলে জঙ্গলের ভিতরই তাঁবু টাঙিয়ে ঘুমাব, যেখানে নেই কোন টয়লেট এবং গোসলের সুব্যবস্থা, বাইরের জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন, সত্যিকারের এক বন্য অ্যাডভেঞ্চার। 

ছোটবেলা থেকেই ভয়ংকর সব গল্প শুনে আসছি এই আমাজন নিয়ে, অ্যানাকোন্ডা, জাগুয়ার, বিষাক্ত ব্যাঙের পাশাপাশি ম্যালেরিয়া, ডেংগু , জীবননাশী হলুদ জ্বর সহ আরও ভয়ংকর সব রোগের আড্ডাখানা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এই বৃষ্টি অরণ্য
। যাবার আগে হলুদ জ্বর, ডিপথেরিয়া, হেপাটাইটিস এ এবং হামের টিকা নিয়ে নিলাম। ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া এবং পানি বিশুদ্ধকারী ট্যাবলেটও সাথে নিলাম। আমাজনে যাবার আগে এসব ব্যাপারে অগ্রিম সাবধানতা অত্যন্ত জরুরী যাতে বিপদের সময় প্রস্তুত থাকা যায়।   

ইকুইতোস শহরে 
ইকুইতোসকে বলা হয় পেরুভিয়ান আমাজনের রাজধানী। চারদিকে আমাজন জঙ্গল দিয়ে পরিবেষ্টিত এই শহরে শুধুমাত্র নদীপথে অথবা বিমান পথে যাওয়া যায়। আমরা বিমানপথে লিমা হয়ে ইকুইতোস পৌছালাম রাত দশটার দিকে। Maniti Camp Expeditions এর মাধ্যমে আগেই আমাজন ভ্রমণ বুক দেয়া ছিল। আমাদের গাইড মিস্টার লুইস এয়ারপোর্টে আমাদের রিসিভ করলেন । শহরে ঢুকেই টের পেলাম প্রচণ্ড ভ্যাঁপসা গরম পড়েছে। চেকইন শেষ করে রুমে গিয়েই ফ্যান ছেড়ে দিলাম। বাংলাদেশের মত বড় সিলিং ফ্যান। আগে যদি জানতাম এখানে এত্ত গরম তাহলে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত রুম নিয়ে নিতাম। গোসল সেরে নিয়ে ডিনার করার জন্য বের হলাম। হোস্টেল থেকে তিন মিনিট হাঁটলেই প্লাজা ডে আরমাস। দেখলাম ওখানে সবাই আড্ডা দিচ্ছে, এক শিল্পী ছবি আঁকছে আর ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চা ছেলে মেয়ে খেলা করছে। ইকুইতোসে সবার প্রথমেই যে জিনিসটা নজর কাড়ল সেটা হচ্ছে, শহর ভর্তি মোটরসাইকেল, টেম্পু গাড়ী, দূষিত বাতাস আর ভ্যাঁপসা গরম - সব মিলিয়ে এ যেন পুরোই ঢাকার শহর।   

ছবিঃ ইকুইতোসের মোটরসাইকেল এবং টেম্পু

ছবিঃ ইকুইতোসের টেম্পুতে করে আমার যাচ্ছি

ঢাকার নীলক্ষেতের তেহারির রেস্তেরার মত  দেখতে একটা রেস্তেরায়  ঢুকলাম ডিনার করার জন্য । ওয়েটার মেনু দিয়ে গেল, স্প্যানিশ মেনু দেখে অর্ডার করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিলো। আমার ভ্রমণসঙ্গী এইব তার মোবাইলের স্প্যানিশ অনুবাদ সফটওয়্যার দিয়ে  বেশ কিছুক্ষন চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিল। ওদিকে আমাদের স্প্যানিশের বেহাল অবস্থা বুঝতে পেরে ওয়েটার ছবিসহ খাবারের একটা মেনু দিয়ে গেল। ছবি দেখে অর্ডার করলাম খিচুরির মত দেখতে একটা আইটেম, সাথে ডিমের অমলেট এবং গ্রিলড চিকেন। রান্না বেশ ভালই হয়েছে, দেশি একটা স্বাদ পাওয়া গেল, পেট পুরে খেলুম। খেতে খেতে ওয়েটারের সাথে আলাপ জুড়ে দিলাম। সতের -আঠারো বছরের  হাসি খুশি বালিকা নাম তার ফ্লোর। সে আমাকে বলল আমি নাকি দেখতে এখানকার লোকদের মত, (পরে এ কথার সত্যতা পেয়েছি, ভালো করে আশে পাশের লোকজনকে খেয়াল করে)। ইকুইতোস শহর এবং এখানকার লোকজনকে কেন যেন খুব আপন মনে হচ্ছিলো, বার বার মনে হচ্ছিলো বাংলাদেশে চলে এসেছি, শুধু ভাষাটাই ভিন্ন।



আমাজনের পথে

পরদিন সকালে নাস্তা সেরেই, গাইডকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আমাজনের উদ্দেশ্যে। প্রথমে ট্যাক্সি নিয়ে নাউতা শহরের ঘাঁটে যেতে হবে। সেখান থেকে নৌকা ভাড়া করে এবং ছয় দিনের খাবার রসদ নিয়ে যাত্রা করব আমাজন জঙ্গলের উদ্দেশ্যে।

নাউতা ঘাটে এসে মনে হলো একবারে বাংলাদেশের মফস্বল শহরের কোনও নদীর ঘাটে চলে এসেছি, এমনকি নৌকা গুলোও আমাদের দেশীয় নৌকার মত দেখতে একেবারে । আমাদের গাইড জুনিয়র লুইসের বাবা সিনিয়র লুইস ঘাটে প্রায় নতুন টেকসই একটা নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করছিলো । ছয়দিন চলার মত বাজার সওদা আর খাবার পানি দিয়ে নৌকা বোঝাই করলাম। লুইস আমাদের দুজনের জন্য রাবারের বুট নিয়ে আসল, জঙ্গলের ভিতর হাঁটার সময় কাজে দিবে। কলার পাতায় মোড়ানো সবজি খিচুরি, ডিম সেদ্ধ আর মুরগির মাংস দিয়ে আমরা আরেক প্রস্থ সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। রান্না বান্নার ঝামেলা এড়ানোর জন্য  আমাজন ভ্রমণের পুরো সময়টুকু আমরা শুধু  দুবেলা খাবার খেতাম - সকালে আর সন্ধ্যায়।

ছবি ঃ খিচুরি, মুরগির মাংস আর ডিম সিদ্ধ দিয়ে কলার পাতায় মোড়ানো সুস্বাদু সকালের নাস্তা 

চমৎকার আবহাওয়া, নীল আকাশ, সবুজ ঘাস এবং নদীর পানিতে আকাশের প্রতিচ্ছবি। এরকম মায়াবী সুন্দর আবহাওয়ার মাঝে নৌকা নিয়ে আমারা বেরিয়ে পড়লাম , গন্তব্য আমাজন।
ছবিঃ আমাজনের পথে

ছবিঃ আমাদের নৌকা
ছবি ঃ আমাজনের উদ্দেশ্যে যাত্রা হল শুরু 
ছবি ঃ আমাজনের উদ্দেশ্যে যাত্রা 
পথে যেতে যেতে দেখা মিলল এক দল সাকি বানরের সাথে, ইয়া বড় এক গাছের মগডালে শুয়ে আছে। মনে মনে নিজেকে অনেক ধন্যবাদ দিলাম , শেষ মুহূর্তে মনে করে একটা দূরবীন কিনে নিয়ে আসার জন্য। দূরবীনের ভিতর দিয়ে মনে হচ্ছিলো আরেকটু হলেই বানরগুলোকে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেয়া যাবে । কিছুদূর যেতেই দেখতে পেলাম একদল মাকড়শা বানর (Spider Monkey) গাছের ডালে খেলা করছে। এই বানরের প্রতিটি বাহু খুব শক্তিশালী, তার চেয়েও শক্তিশালী এদের লেজ। লেজ আর বাহু মিলিয়ে বানরটিকে অনেকটা পাঁচ বাহুর প্রাণীর মতো দেখায়। হাতের বা পায়ের পাশাপাশি এরা লেজ ও বাহু গাছের ডালে পেঁচিয়ে স্বাধীনভাবে উপর থেকে ঝুলতে পারে। যখন ওরা এভাবে ঝুলে থাকে তখন দেখতে অনেকটা মাকড়শার মতো দেখায়। এখান থেকেই ওদের নাম দেয়া হয়েছে মাকড়শা বানর। প্রকৃতির মাঝে বানরগুলোর  খেলা দেখে মন জুড়িয়ে গেল।
ছবিঃ সাকি বানর

ছবিঃ মাকড়শা বানর


ছবিঃ মাকড়শা বানর

নৌকার লগি দিয়ে জলজ গাছপালা সরিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ এইবের চিৎকার শুনে সামনে তাকিয়ে দেখি লম্বা ডোরাকাটা এক সাপ কচুরিপানার উপর দিয়ে কিলবিল করে হেঁটে যাচ্ছে! কিছু বলার আগেই লুইস লগি দিয়ে এক ঘা বসিয়ে দিল সাপের মাথা বরাবর। তারপর মৃত সেই সাপকে নৌকায় তুলে আনল সে। কোন কারন ছাড়াই এভাবে একটি বন্য প্রাণীকে মেরে ফেলায় লুইসকে হালকা তিরস্কার করলাম। লুইস হেসে দিলো, বুঝলাম আমাদের দেশের গ্রামের মানুষের মত তার কাছে আমার সাপ না মারার যুক্তি অচল। সাপ দেখলেই মেরে ফেলার একাটা অলিখিত বিধান এখানেও প্রচলিত আছে।

ছবিঃ জলজ গাছপালাগুলো ছিল সাপের আড্ডাখানা

ছবিঃ লুইসের হাতে অক্কাপ্রাপ্ত সাপ ।


আমজনে একটা জিনিস খেয়াল করলাম, চারদিকে বিভিন্ন জাতের মাকড়শা, পিঁপড়া থেকে শুরু করে অসংখ্য কীটপতঙ্গ ছুটাছুটি করছে। আমার চোখের সামনেই একটা মাকড়শাকে দেখলাম অসীম দক্ষতায় জাল বুনে পোকামাকড় ধরা শুরু করলো। চারদিকে ক্ষুদ্র জীবনের ছড়াছড়ি ।




ছবি ঃ নৌকার ভিতর মাকড়শার বাসা
ছবি: গাছের ডালে পিঁপড়ার ঢিবি ঝুলছে 





ছবি ঃ ম্যাকাও পাখির ঝাঁক  
ছবিঃ বৈঠা হাঁতে গাইড লুইস  



ক্যাম্পিং


সারাদিন নৌকা করে ঘুরে সন্ধ্যার একটু আগে আগে আমাদের ক্যাম্প সাইটে পৌছালাম। সিনিয়র লুইস আগুন জ্বালিয়ে রান্না করতে বসে গেল, আমি এবং এইব কিছু শুকনা গাছের ডাল পাতা জোগাড় করে নিয়ে আসলাম জঙ্গল থেকে। গাইড জুনিয়র লুইস তাঁবুর ব্যবস্থা করল। তাঁবু বলতে একটা গাছের ডাল দিয়ে বানানো মাচার উপর তোশক আর মশারী পাতা। রাতে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হওয়ায় উপড়ে তারপুলিন টাঙিয়ে দেয়া হল । সূর্য ডোবার  পরপরই আমরা রাতের খাবার সেরে নিলাম, খেয়ে দেয়ে  দুই ঘণ্টার একটা হাল্কা ঘুম দিলাম। চারদিকে রাতভর পশু পাখির হাঁক ডাক এবং ভ্যাঁপসা গরমে বেশ অস্থির লাগছিল। 
ছবিঃ আমাজন জঙ্গলে আমাদের তাবু


ছবি ঃ রান্না বান্না নিয়ে ব্যস্ত লুইস আংকেল 


ছবি ঃ রাতের খাবার 

কুমির শিকার

গভীর রাতে গাইডের ডাকে ঘুম ভাঙল, কেইমন শিকার করতে যাবো নৌকা নিয়ে । কেইমন হচ্ছে কুমির প্রজাতির একটি সরীসৃপ যাতীয় প্রাণী যা দেখতে অনেকটাই কুমিরের মত, কিন্তু আকার কিছুটা ছোট । সব আলো নিভিয়ে দিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকারে নৌকা নিয়ে বের হলাম সবাই। গাইডের ভাষ্য অনুযায়ী নদীর যেখানে কচুরিপানার মত জলজ গাছপালায় ভরতি সেখানে বাচ্চা কেইমন লুকিয়ে থাকে ।   

টানটান উত্তেজনা, সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে চুপচাপ নৌকা নিয়ে আগাতে থাকলাম একটা জলার দিকে। কাছাকাছি আসতেই ফিসফিস করে গাইড বলল যে সে একটা বাচ্চা কেইমন দেখতে পেয়েছে, কচুরিপানার ভিতর। হেডল্যাম্প জ্বালিয়ে আমারা ধীরেধীরে এগুলাম। লুইস আন্ডি পড়ে পানিতে নেমে গেল কেইমান ধরার জন্য। কিছুক্ষন পর ধস্তাধস্তির আওয়াজ শোনা গেল এবং লুইস লাফ দিয়ে নৌকায় উঠে আসল, হাতে কেইমনের বাচ্চা! আমারা সবাই একে একে হাতে নিয়ে দেখলাম। হাতে নিয়ে দেখার সময় কেমন জানি একটা শিরশিরে অনুভুতি হল আমার শিরদাঁড়া বেয়ে।


ছবিঃ কেইমন শিকার
ছবিঃ কেইমন হাতে আমি

 
কিছুক্ষন পর লুইস জিজ্ঞেস করল আমাদের কেউ নিজহাতে কেইমন শিকার করতে আগ্রহী কিনা? গভীর রাতে কচুরিপনায় ভর্তি জলায় নামার কথা চিন্তা করে আমি এক বাক্যে না করে দিলুম। এইব বলল সে চেষ্টা করে দেখতে আগ্রহী, আমিও মজা দেখার জন্য এইবকে উৎসাহ দিলাম। আরকেটা কেইমন খুঁজে বের করার পর লুইস এইব কে বলল ধীরেধীরে ঘাড়ের পিছনে হাত দিয়ে ধরার জন্য, এইব একটু ইতওস্ত করায় আমি অভয় দিলাম এই বলে যে বাচ্চা কেইমন রাতের বেলায় দেখতে পায় না (চোখটিপ দেয়ার ইমো হবে)। অবশেষে এইব কিছুটা সাহস সঞ্চার করে খপ করে কেইমনের টুটি ছেপে ধরল! সবাই হাত তালি দিয়ে বাহবা দিলাম এইবকে তার সাহসের জন্য, হেডল্যাম্পের আলোয় ছবি নিলাম বেশ কয়েকটা কেইমনের বাচ্চার। (চলবে)


(পরের পর্বে থাকছে আমাজনের ভয়ংকর পিরানহা শিকার, গোলাপি ডলফিন আর স্লথ দেখা নিয়ে লেখা )



Comments