Bhutan (Thimphu - Punakha - Paro)

আমাজনের জঙ্গলে (পর্ব ২)

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পরলাম। মাচার আশেপাশে চারদিকে কাঁদামাটি , রাবারের লম্বা বুট পড়ে চলাফেরা করতে হয়। বারবার কাঁদামাখা বুট খোলা এবং পড়া একাটা ঝামেলার ব্যাপার, আবার সারাক্ষন বুট পরে থাকতেও গরমে অস্বস্তি লাগে। বন্ধু এইব গতকাল রাত থেকেই অভিযোগ করা শুরু করেছে আমাজনের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, মশা, আর আমাদের গাইডের রান্নাবান্নার অপরিছন্নতা নিয়ে। পুরো পরিকল্পনাটা আমার বলে আমাকে মৃদু দোষারোপ করতে ছাড়ল না। আমি বোঝাতে চেষ্টা করলাম হোটেলের আরামদায়ক পরিবেশে ট্যুরিস্ট টাইপের ভ্রমণ তুমি সারাজীবনই করতে পারবে কিন্তু আমাজনের গহীন জঙ্গলে এরকম ক্যাম্পিং করার সুযোগ জীবনে একবারই আসে, আর অনেক বছর পর এই অ্যাডভেনচারের স্মৃতি নাতি নাতনিদের কাছে গর্ব ভরে বলতে পারবে। এইব অবশেষে কিছুটা শান্ত হলো এই আশ্বাস দেয়ার পরে যে আমি গাইড কে বলে একটা ইন্ডিয়ান গ্রামে নিয়ে ওর গোসলের এবং রাতে থাকার ব্যবস্থা করব, সে টানা ছয়দিন এই ভ্যাঁপসা গরমে গহীন জঙ্গলে থাকতে পারবে না ।

ছবিঃ রাবারের বুট
রাবারের বুট পড়ে নিয়ে প্রকৃতির ডাক সারতে জঙ্গলের দিকে হাটা দিলাম। সিনিয়র লুইস নাস্তা তৈরি করতে বসে গেল আর আমি, এইব এবং জুনিয়র লুইস পাশের জঙ্গলে একটা ছোটখাটো হাইক করতে বের হলাম। পথে বেশ কয়েকটা পিঁপড়ার ঢিবি, মাকড়শার জাল  আর হরেক রকমের কীটপতঙ্গ চোখে পড়ল। এক জায়গায় কাদামাটিতে নখের ছাপ দেখে লুইস বলল এটা জাগুয়ারের পায়ের ছাপ। আমাদের ক্যাম্পের এত কাছে বাঘমামার পায়ের ছাপ দেখে বেশ ভয় পেয়ে গেলাম।


ঘন জঙ্গলে হাইক কর্মের জন্য ম্যাচাটি (এক ধরনের বড় দা)   দিয়ে গাছপালা কেটে পথ তৈরি করে এগুতে হচ্ছিল।  পথে একটা পরিত্যক্ত পিঁপড়ার ঢিবি দেখে ভাঙার চেষ্টা করলাম। ম্যাচাটি দিয়ে বেশ কয়েকবার জোরে আঘাত করার পরও তেমন কিছুই হল না। পাথরের মত শক্ত মাটি !  কয়েকবার চেষ্টা করার পর হাল ছেড়ে দিলাম।  

 ছবিঃ ম্যাচাটি নিয়ে ভাব

 ছবিঃজঙ্গলে হাইক


ছবিঃটারজান হবার চেষ্টা :)
বেশ কিছুক্ষন হাঁটাহাঁটি করার পর বেশ ক্ষুধা পেয়ে গেল, ফেরার পথ ধরলাম । ক্যাম্পে ফিরে নাস্তা সেরে নিলাম শুকনা পাউরুটি, আলু এবং ডিম সেদ্ধ দিয়ে।  নাউতার ঘাট থেকে আমরা ফিল্টারড পানি নিয়ে এসেছিলাম, তারপরও অতিরিক্ত সাবধানতা হিসেবে একটা পানি বিশুদ্ধকরন ট্যাবলেট মিশিয়ে নিলাম। ডায়রিয়া হলে এই বন জঙ্গলে বেশ বিপদে পড়ে যাবো।     


নাস্তা শেষে নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পরলাম অজানার উদ্দেশ্যে । পাশেই একটা জলায় নৌকা থামিয়ে দিয়ে লুইস ঘোষণা দিল এখানে দেখা মিলবে ভয়ঙ্কর পিরানহার! আমরা সবাই বঁড়শি আর টোপ নিয়ে রেডি হলাম। কয়েক সেকেন্ডের ভিতরে বঁড়শিতে টান অনুভব করে একটানে তুলে ফেললুম। দেখলুম বঁড়শির মাথায় মাঝারী আকারের একটা পিরানহা লাফাচ্ছে! ইয়া চিৎকার দিয়ে নৌকায় তুলতে  তুলতে বঁড়শি থেকে পিরানহা ফসকে গিয়ে পানিতে পরে গেল। হতাশ হয়ে আবারো নতুন টোপ ফেল্লুম । সিনিয়র লুইস ইতিমধ্যে তিনখানা পিরানহা ধরে ফেলেছে । খানিকটা ঈর্ষান্বিতও বোধ করলেও চেষ্টা চালিয়ে গেলাম। কিছুক্ষনের ভিতরই সাফল্য ধরা দিল।  ধরে ফেল্লুম বেশ কয়েকটা ভয়ংকর পিরানহা এবং ছোট আকারের বেশ কয়েকটা শিং মাছ! ছোট আকারের পিরানহাগুলো কেটে সেগুলো দিয়েই টোপ বানানো হচ্ছিল। কিছুক্ষণের ভিতর এইবের বঁড়শিতেও কিছু একটা হানা দিল । এইব অনেক টানাটানি করে সর্বশক্তি দিয়ে বঁড়শি তোলার চেষ্টা করেও পারল না । কিছুক্ষণ টানাটানি করার পর মাছ ধরার পুলিটাই মাঝ বরাবর ভেঙ্গে গেল। নিঃসন্দেহে বেশ বড় আকারের কোনও মাছ হবে। ভেঙ্গে যাওয়া পুলি ফেলে দিয়ে হতাশ এইব কে নতুন পুলি দেয়া হল :)       

ছবিঃ পিরানহা শিকার


ছবিঃ পিরানহা শিকার

এইবের সাথে বাজী ধরলাম যে আমি ওর চেয়ে বেশী পিরানহা ধরবো। এক ঘণ্টা যাবত মাছ ধরার পর গুনে দেখলাম এইব ধরেছে ১২ টা আর আমি ১৪ টা! লুইস মাছ গুলো গুছিয়ে রাখল, দুপুরে মাছ রান্না করা হবে।
মাছ ধরার পর্ব শেষে আমরা নৌকা নিয়ে বের হলুম দূরের একটা ইন্ডিয়ান গ্রাম দর্শনের  জন্য। ওখানেই আমাদের গোসল, দুপুরের খাবার এবং রাতে থাকার ব্যবস্থা হবে । পানির উপর বাঁশের মাচা দিয়ে ছোট একটা পরিবার নিয়ে এই ইন্ডিয়ান গ্রাম। লুইস পরিচয় করিয়ে দিলো আমাদের বাড়ীর বাসিন্দাদের সাথে। চার বছরের ছোট বাচ্চা কালুন এবং তার নানী কে নিয়ে ছোট্ট পরিবার। কালুনের মা ইকুইতোস শহরে চাকুরী করে । বেশ কয়েক বছর আগে অস্ট্রেলিয়ান এক এনজিও কর্মীর সাথে কালুনের মার প্রণয়,  সেখান থেকে অবৈধভাবে কালুনের জন্ম। কালুন যখন পেটে তখন ওর  বাবা অস্ট্রেলিয়া চলে গিয়ে আর ফিরে আসে নি এবং কোনও যোগাযোগও করেনি। ছোট্ট কালুনের দুঃখের ইতিহাস জেনে খুব খারাপ লাগলো । এভাবেই হয়তোবা অনেক লম্পট বিদেশি দেশি মেয়েদের সরলতার সুযোগ নিয়ে, তাদেরকে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে, তাদের সর্বনাশ করে। কালুনের মা এরকম শত শত কাহিনীর একটা উদাহারন মাত্র। (ছবিঃ কালুন ও তার দূরবীন )


ছবিঃ ছবির মত সাজানো গ্রাম

কালুনের সাথে বেশ কিছুক্ষণ খেলা করলাম। আমাদের দূরবীন নিয়ে ওর অসাধারণ আগ্রহ দেখে এইব তার ছোট দূরবীনটা কালুনকে দিয়ে দিলো। লুইস এবং তার বাবা পিরানহা রান্না করতে বসে গেল। আমারা পনিতে নেমে কোনরকমে গোসলটা সেরে নিলাম। যদিও গা রী রী করছিলো যে পানিতে গোসল করছি সেই পনিতেই কিছুদূরে ল্যাট্রিন দেখে। গোসল শেষে গরম গরম ভাত এবং পিরানহা মাছ দিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। পিরানহা খেতে খারাপ না অনেকটাই কৈ মাছের কাছাকাছি স্বাদ পাওয়া গেল।

ছবিঃ পিরানহা দিয়ে ডিনার 

খাবার শেষে আমারা নৌকা নিয়ে বের হলাম গোলাপি ডলফিন দেখার জন্য। আধাঘণ্টার মত নৌকা নিয়ে আগানোর পর বেশ প্রশস্ত  একটা নদী নজরে আসল। দেখা মিলল অ্যামাজনের মায়াবী গোলাপি ডলফিনের। হঠাৎ করেই বলা নেই কওয়া নেই  মুশুলধারে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। আমারা নৌকার ছইয়ের  নিচে বসে আছি নদীর মাঝে, চারদিকে ঝুম বৃষ্টি, অনন্য এক অনুভূতি! বৃষ্টি শেষ হতে না হতেই চোখে পরলো অপূর্ব সূন্দর রংধনু! প্রকৃতি আজ যেন দুহাত ভরে তার মায়াবী রূপে সেজেছে শুধু আমাদেরই জন্য। নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছিলো। নদীর মাঝে বসেই উপভোগ করলাম রক্তিম সূর্যাস্ত । ভালবাসার মানুষটিকে খুব কাছে পেতে ইচ্ছা করছিল এমন সূন্দর মুহূর্তে।  


ছবিঃ গোলাপি ডলফিন 

ছবিঃ রংধনু

ছবিঃ আমাজনে রক্তিম সূর্যাস্ত

রাতে কালুনের পরিবারের সাথে বাঁশের মাচায় রাত কাটালাম।
     
পরদিন সকালে লুইস ঘোষণা দিল আজকে দেখা মিলবে আমজনের বিখ্যাত প্রাণী স্লথের। আমারা সকাল সকাল নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। প্রায় দুই ঘণ্টা যাবত নৌকাভ্রমণ শেষে আমরা একটা ঝুলন্ত শেকড়আলা বিশাল গাছের নিচে থামলাম।  এখানেই দেখা মিলবে স্লথের। স্লথ গাছের ডালের সাথে মিশে থাকে তাই তাদের খোঁজ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু লুইসের চোখ যেন দূরবীনের চেও ধারালো, সে ঠিকই খুঁজে পেল একটা স্লথকে গাছের উঁচু মগডালে! আমি যেখানে দূরবীন দিয়ে অনেক চেষ্টা করেও কিছু দেখতে পেলাম না, সেখানে খালি চোখে লুইসের কেরামতি দেখে বিস্মিত হলাম।

লুইস জামা কাপড় খুলে সুধু জাইঙ্গা পরে তড়তড় করে গাছে উঠে গেল স্লথকে ধরে আনার জন্য। আমাদের সাড়া পেয়ে স্লথ অনেক চিকন একটা ডালে গিয়ে আশ্রয় নিল।  লুইসও নাছোড়বান্দা, ডাল ধরে ঝাকাঝাকি শুরু করে দিল। কিছুক্ষন পর হঠাৎ থপ করে একটা শব্দ হোল, স্লথ গাছের মগডাল থেকে পানিতে পরে গেছে। আমরা ভঁয় পেয়ে গেলাম কিন্তু লুইস অভয় দিয়ে বলল জে স্লথ সাঁতার জানে, ডুবে যাবে না । পানি থেকে শ্লথটাকে তোলার পর দেখা গেল এটা একটা মা স্লথ এবং সাথে পিচ্চি একটা বাচ্চা আছে! আমার খুবি খারাপ লাগছিল অবলা প্রাণীটাকে এভাবে কষ্ট দেয়ার জন্য। তাড়াতাড়ি বেশ কেকটা ফটো নিয়ে মা আর  বাচ্চাটাকে জঙ্গলে ছেঁড়ে দেবার ব্যাবস্থা করলাম।  

ছবিঃ স্লথের খোঁজে 
স্লথ বানরের মত দুই পায়ে দাড়াতে পারে না, এদেরকে ধরে থাকার জন্য সবসময় কিছু একটা দিতে হয় , যা অবলম্বন করে এরা আঠার মত লেগে থাকে।


ছবিঃ মা এবং বাচ্চা স্লথ


ছবিঃ বাচ্চা স্লথের সাথে আমি।


Comments